মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১; দুঃস্বপ্নে ভরা দু’টি যুগ। বাঙ্গালীদের জন্য এই দীর্ঘ সময়টা ছিল দুষ্কাল। পাকিস্তানীদের দুঃশাসন আর প্রতারণায় বিপর্যস্ত এদেশের মানুষ নিজেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্রমশঃ অনুধাবন করতে পেরেছিল তাদের সংকটাপন্ন অস্তিত্বকে। ফলে ‘আত্ম-পরিচয়’ উদ্ধারের অন্তর্গত তাড়নায় তারা ক্রমে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল-পাকিস্তানী দুঃশাসনকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেছিল-জাতিসত্ত্বার বিকাশকল্পে স্বাধীনতা-প্রবণ হয়ে পড়েছিল। সেই স্বাধীনতার জন্য এদেশের মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল দীর্ঘ ২৩টি বছর। একাত্তরে সুদীর্ঘ ন’ মাসের রক্তাক্ত যুদ্ধের পর অবশেষে বিশ্ব-মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। ১৯৭১-এ সংঘটিত সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ আজ এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ সেই ইতিহাসেরই একটি অবিস্মরণীয় অংশ; এ অঞ্চলের মুক্তি-পাগল জনগণের অসীম বীরত্ব, সাহসিকতা আর আত্মদানের অমর অধ্যায়।  কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে এ অঞ্চলের মানুষ পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খা শহর থেকে গ্রামে, গ্রামান্তরে ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সংগঠিত হতে থাকে আপামর জনসাধারণ।

 

৯ মার্চ, ১৯৭১; কুড়িগ্রাম পুরাতন পোস্ট অফিস প্রাঙ্গণে, লিচুতলায় অনুষ্ঠিত হয় একটি বিশাল জনসভা। এই জনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণরত কুড়িগ্রামের তৎকালীন ছাত্র হাবিবুল্লাহ বাহার খান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এবং হলসমূহে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অতর্কিত হামলা ও নৃশংসতার বর্ণনা দেন। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন জনৈক ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন। জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিঞা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নুরুল আমিন মজনু, সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু প্রমুখ। এরপর কুড়িগ্রামে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ১০ মার্চ (মতান্তরে ১৪ মার্চ), ১৯৭১-এ মহকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এই সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক ছিলেন যুগ্মভাবে জনাব আহাম্মদ হোসেন সরকার ও আহম্মদ আলী বকসী। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন সর্বজনাব আমানউল্যাহ,       মনির হোসেন, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিঞা, সামাদ মিঞা, এ.টি.এম আফজাল হোসেন দুলাল, সাইফুল আলম দুলাল, সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু, সমরেন্দ্র রাম বকসী, অজয় কুমার বকসী, রবীন্দ্রনাথ (খোকন) সরকার, মোস্তফা মর্তুজা বিন হোসেন খন্দকার, অধ্যাপক হায়দার আলী, তাছাদ্দুক হোসেন, অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান, উলিপুরের কানাই লাল সরকার, ভূরুঙ্গামারীর শামসুল হক চৌধুরী, ফুলবাড়ীর ইউনুছ আলী, রৌমারীর নুরুল ইসলাম পাপু, চিলমারীর সাদাকাত হোসেন (ছক্কু মিঞা), রাজারহাটের আব্দুল্লাহ সরওয়ার্দী, নাগেশ্বরীর মজাহার হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হাকিম ও ওয়াসেক ডাক্তার, লালমনিরহাটের আবুল হোসেন প্রমুখ। ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন মঞ্জু মন্ডল, শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, আখতারুজ্জামান মন্ডল, মোঃ রওশন-উল-বারী, সাজু, শাহাবউদ্দিন,  রুকনুদ্দৌলা মন্ডল, নুর ইসলাম, নুরুল আমিন মজনু, নুরন্নবী, কাজল প্রমুখ।

 

এরপর উত্তাল হয়ে ওঠে কুড়িগ্রাম। স্বাধীনতার তীব্র আকাংখায় সাগরের মতো উন্মত্ত হয়ে ওঠে জনগণ। মিছিলের পদভারে, শ্লোগানের উচ্চকিত নিনাদে প্রকম্পিত হতে থাকে এই জনপদ।এদিকে ১৭ মার্চ কুড়িগ্রামের সবুজ পাড়াস্থ চিলড্রেন পার্কে বিকেলে অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনসভায় একটি শিশুকে দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলনের পর তৎকালীন ছাত্রনেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, আমিনুল ইসলাম, মোঃ রওশন-উল-বারী, রুকনুদ্দৌলা মন্ডল প্রমুখের নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্র-জনতার অনেকেই সুঁচ দিয়ে নিজ নিজ শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়ে তা ছুঁয়ে স্বাধীনতার জন্য রক্ত শপথ উচ্চারণ করেন।

 

১৮ মার্চ তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে উড্ডীয়মান পাকিস্তানী পতাকা পোড়াতে গিয়ে গ্রেফতার হন সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু, জোবেদ আলী সরকার, আববাস আলী, সুজাম ও খোকন ঘোষ। ২৩ মার্চ তাঁদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তীকালে কুড়িগ্রামের মহকুমা প্রশাসক মামুনুর রশীদ (সিএসপি), দ্বিতীয় কর্মকর্তা আব্দুল হালিম ও তৃতীয় কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সংগ্রাম কমিটি গঠন হবার পর থেকে শুরু হয় ব্যাপক কর্মতৎপরতা। কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়াস্থ আহম্মদ আলী বকসীর গুদামে সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুম এবং শহর থেকে প্রায় ৪ মাইল দূরে টোগরাইহাট রেলস্টেশনের অনতিদূরে আহাম্মদ হোসেন সরকারের বাড়িতে গড়ে তোলা হয় প্রতিরোধ দূর্গ। শহরের পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়া ও ঘোষপাড়ায় দু’টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয়। অন্যদিকে মহকুমা সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে থানাগুলোতে চলতে থাকে ব্যাপক জনসংযোগ ও অন্যান্য প্রস্ত্ততিপর্ব। প্রথমদিকে ১৭ মার্চের আগ পর্যন্ত প্রশাসনিক কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা বা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ছাত্ররা নিজেদের উদ্যোগে অধ্যাপক মোস্তফা মর্তুজা বিন হোসেন খন্দকার-এর সহযোগিতায় কিছু হাতবোমা তৈরি করেছিল, যা শত্রু মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ৭ মার্চ থেকে শুরু করে একটানা ২০ দিন প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয় কয়েকটি প্রতিরোধ দূর্গ। প্রধান প্রতিরোধ দূর্গগুলো ছিল টোগরাইহাট, মোগলবাসা, ফুলবাড়ীর ভাঙ্গামোড়, উলিপুরের বালাহাট ও হাতিয়া, কুড়িগ্রামের তিস্তা। প্রতিরোধ দূর্গের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ, সুবেদার আরব আলী, বোরহান উদ্দিন, সাইফুল আলম দুলাল, বাকি, সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু, ঈসমাইল হোসেনসহ আরো অনেকে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ ও তার কয়েকজন বাঙালি সিপাহী মার্চের ২য় সপ্তাহে রংপুর ই,পি,আর (বর্তমানে বিডিআর) ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে সংগ্রাম কমিটিতে যোগ দেয়ায় সংগ্রাম কমিটির তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায়। সংগ্রাম কমিটির সহায়তায় প্রথমে তিনি প্রশাসনিক স্বীকৃতি লাভের চেষ্টা করেন। সংগ্রাম কমিটির পক্ষে তাঁর এ কাজে বিশেষভাবে সাহায্য করেন রিয়াজউদ্দিন আহামেদ ভোলা মিঞা, আহাম্মদ হোসেন সরকার, এডভোকেট আমানউল্যাহ, তাছাদ্দুক হোসেন, অধ্যাপক মোস্তাফা মর্তুজা বিন হোসেন খন্দকার, সাইফুল আলম দুলাল, সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু ও রুকুনুদ্দৌলা মন্ডল।

 

এরপর ঘটে ২৫ মার্চ, ১৯৭-এ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ঘটনা। এই দিন দিবাগত রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা ঘুমন্ত বাঙ্গালীদের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘরে, বাইরে, রাজপথে নির্বিচারে হত্যা করে নিরীহ বাঙ্গালীদের। ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিকান্ডে সৃষ্টি হয় নারকীয় পরিবেশ। সেদিনের ওই নৃশংসতা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায়। পরদিন ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন পুনর্বহালের ঘোষণা বেতার মারফত প্রচারিত হয়। ওই দিনই কুড়িগ্রামের সংগ্রাম কমিটি ঘোষপাড়াস্থ আহম্মদ আলী বকসী সাহেবের গোডাউনে অবস্থিত কমিটির কার্যালয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সভায় মিলিত হয়ে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করে।

 

২৮ মার্চ,১৯৭১; কুড়িগ্রামের গওহর পার্কে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল জনসমাবেশ। ওই জনসমাবেশে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানানো হয়। তারপর সন্ধ্যায় সংগ্রাম কমিটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বেসরকারী হাই কমান্ড গঠন করা হয়। ওই বেসরকারী হাই কমান্ড পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ এবং ই,পি,আরদের সংগঠিত করতে থাকে। স্থানীয় থানা এবং ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সংগৃহীত রাইফেল, বন্দুক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। সেসব অতি সাধারণ অস্ত্র দিয়ে তারা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

 

মহকুমা প্রশাসক মামুনুর রশীদ (সিএসপি) এবং মহকুমা পুলিশ প্রশাসক জালাল উদ্দিন সংগ্রাম কমিটির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলে প্রশাসনিক কাজকর্ম সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে চলতে থাকে। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশউদ্দিন সাপোর্ট প্লাটুনের অধিনায়ক নায়েব সুবেদার নূর মোহাম্মদসহ চিলমারী, মোগলহাট, পাটগ্রামের কয়েকজন সৈনিককে অবাঙ্গালী ই,পি,আরদের হত্যা করে কুড়িগ্রামে এসে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। সেই মোতাবেক কোম্পানী কমান্ডারগণ ৩১ মার্চ কুড়িগ্রামে এসে সমবেত হন। স্থানীয় পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্রজনতা এবং ই,পি,আর-দের নিয়ে একটি সম্মিলিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এরপর শুরু হয় অস্ত্র সংগ্রহ এবং মুক্তিবাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণ। মহকুমার সকল সীমান্তের ই,পি,আর বাহিনীকে অস্ত্রসহ কন্ট্রোলরুমে ক্লোজ করে আনা হয়। অস্ত্র সংগ্রহ ও ই,পি,আর ক্লোজের প্রথম সূচনা করা হয় ভূরুঙ্গামারী থানার জয়মনিরহাট বিওপি ক্যাম্প থেকে।

 

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট শহরকে পাকবাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য ১ এপ্রিল থেকে তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পাড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলা হয়। ৩ এপ্রিল পাকবাহিনী তিস্তা ব্রীজের পশ্চিম পাড়ে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর প্রচন্ড গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে। ৪ এপ্রিল পাকবাহিনী ও রাজাকাররা লালমনিরহাট দখল করলে মুক্তিযোদ্ধারা ৫ এপ্রিল কুড়িগ্রামে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। ৫ এপ্রিল কুড়িগ্রাম চিলড্রেন পার্কের এক জনসভায় মুক্তিযোদ্ধারা জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহবান জানায়। ওইদিনই হেডকোয়ার্টার নাগেশ্বরীতে স্থানান্তর করা হয়। শহরের ভীতসন্ত্রস্ত জনগণ ৫ ও ৬ এপ্রিলের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বিভিন্ন দিকে চলে যায়। সে সময় শহর এক প্রকার জনশূন্য হয়ে পড়ে।

 

৭ এপ্রিল, ১৯৭১; পাকবাহিনী সাঁজোয়া বহর নিয়ে লালমনিরহাট এবং রংপুর থেকে এসে মিলিত হয়ে একযোগে কুড়িগ্রামের দিকে গুলিবর্ষণ করতে করতে অগ্রসর হয়। বিকেলের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতুল প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। তারা বর্তমান সার্কিট হাউজের সামনে এসে পজিশন নিয়ে গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে। সে সময় জেলখানার কর্তব্যরত ইনচার্জ ও পাঁচজন সিপাহীকে পাকবাহিনী হুইসেল বাঁজিয়ে ডেকে নেয় এবং সার্কিট হাউসের (বর্তমানে নির্মিত) সামনের রাস্তায় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। ব্রাশ ফায়ারে তৎক্ষণাৎ শহীদ হন লাল মোহাম্মদ, আনসার আলী, সাজ্জাদ আলী ও জহির উদ্দিন। গুরুতরভাবে আহত জেল-ইনচার্জ শেখ হেদায়েত উল্লাহ ওইদিন রাত এগারটায় মারা যান। বাকী একজন সিপাহী আব্দুল জলিল গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। মূলতঃ ৭ এপ্রিল পাকবাহিনীর হাতে নিহত জেল-ইনচার্জ ও চার সিপাহী মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রাম এলাকায় প্রথম শহীদ। পাকবাহিনী ওইদিনই কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে তিস্তার দিকে ফেরত চলে যায়। পরে স্থানীয় ছাত্রনেতা হারুন-অর-রশিদ লাল ও ছাত্র মহিউদ্দিন বহু কষ্টে শহীদদের লাশ দাফন করে। হাজতীরা তখন জেলখানায় ছিল। জেল-ইনচার্জের স্ত্রী পরে জেলখানার তালা খুলে দিলে হাজতীরা বের হয়ে পালিয়ে যায়।

 

৮ এপ্রিল ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ কুড়িগ্রামে এক বৈঠকে রংপুরকে একটি সেক্টর ঘোষণা দিয়ে এই অঞ্চলকে দু’টি সাব-সেক্টরে ভাগ করে। এর একটির হেড কোয়ার্টার করা হয় পাটগ্রামে। পাটগ্রামের দায়িত্ব দেয়া হয় সুবেদার বোরহান উদ্দিনকে। অন্য সেক্টরটির হেড কোয়ার্টার ভূরুঙ্গামারীতে করা হয়। সেটির দায়িত্ব দেয়া হয় সুবেদার আরব আলীকে। সার্বিক দায়িত্বে থাকেন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশউদ্দিন স্বয়ং।

 

১২ এপ্রিল সুবেদার আরব আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ৪ কোম্পানী সৈন্য ও একটি সাপোর্ট প্লাটুন গভীর রাতে লালমনিরহাট বিমান বন্দরে অবস্থানরত পাকবাহিনীর উপর হামলা চালায়। এই হামলা সফল হয়নি। কেননা পাকবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো ছিলো অত্যাধুনিক-এর বিপরীতে মুক্তিবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো ছিল মান্ধাতার আমলের। ফলে তাঁরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

১৪ এপ্রিল পাকবাহিনী পুনরায় ট্রেনযোগে এসে কুড়িগ্রামের উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকবাহিনী সেদিন কুড়িগ্রাম শহরে ঢুকতে পারেনি। তারা নতুন রেলস্টেশন পর্যন্ত এসে আবার পিছু হটতে বাধ্য হয়। সে সময় পাকবাহিনী ছফর ডাক্তারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং ডাঃ ছফর উদ্দিন, সজর উদ্দিন, আব্দুল লতিফ, সাহাবুদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যা করে টোগরাইহাটের বড় ব্রীজের পাশে ইটভাটায় আশ্রয় নেয়। সেখানে রাতভর পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড গুলি বিনিময় হয়। সে যুদ্ধে আমজাদ হোসেন, জয়নালসহ ছয় জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকবাহিনীরও কয়েকজন নিহত হয়। ১৫ এপ্রিল সকালে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পাকবাহিনী তিস্তার দিকে পিছু হটার সময় রেল লাইনের দু’ধারের বাড়িঘরে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে।

 

এদিকে কুড়িগ্রাম বাজারের কালিবাড়ী সংলগ্ন ‘‘ চিটাগাং ক্লথ স্টোর’’-এ অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী ১৬ এপ্রিল তাদের শিবির পুরাতন ডাকঘর পাড়ার ‘‘নাহার ভিলা’’য় স্থানান্তর করে। পরদিন ১৭ এপ্রিল কুড়িগ্রাম মহকুমার এসডিও মামুনুর রশীদ, শামসুল হক চৌধুরী, সুবেদার বোরহান উদ্দিন, ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউদ্দিন আহমেদ, প্রফেসার হায়দার আলী, আখতারুজ্জামান মন্ডল, তাছাদ্দুক হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম ন্যাশনাল ব্যাংক ও ট্রেজারীতে রক্ষিত টাকা পয়সা ও সোনাদানা তালা ভেঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় ২০ জন ই.পি.আর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। টাকার পরিমাণ ছিল এক কোটি ষাট লক্ষ ষাট হাজার টাকা। কেবল ষাট হাজার টাকা ভূরুঙ্গামারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে ব্যয়ের জন্য রেখে বাকি টাকা ভারতীয় ব্যাংকে জমা রাখা হয়। এ সময় নাগেশ্বরী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার ভূরুঙ্গামারীতে স্থানান্তর করা হয়।

 

২০ এপ্রিল, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ই,পি,আরদের নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানীয় যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ওইদিন দুপুর ২টার দিকে খবর আসে পাকবাহিনী কুড়িগ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ই.পি.আর’রা নতুন শহরে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকবাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্রের প্রচন্ড গোলাবর্ষণের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতুল প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়। সন্ধ্যার দিকে পাকবাহিনী নতুন শহরে প্রবেশ করে। সেদিনই কুড়িগ্রাম শহর পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়।

 

২০ এপ্রিল পাকবাহিনী কুড়িগ্রাম শহর দখল করার পর মুক্তিবাহিনী ধরলা নদীর পূর্বপাড়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে। ২৪ এপ্রিল থেকে ভূরুঙ্গামারী সোনাহাট হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। পাশাপাশি ভূরুঙ্গামারী থানা সদরেও একটি প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। ২২ এপ্রিল ভোরবেলা প্রতিরক্ষার স্বার্থে রায়গঞ্জ ব্রীজটি তিন’শ গানকটন সেট করে উড়িয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে ধরলা নদীর পূর্বপাড়ে বিশাল এলাকা নিয়ে দৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলা হয়। এখানে ধরলা নদীর পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থানরত পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায়ই প্রচন্ড গোলাগুলি হতো।

 

এদিকে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা সেনাবাহিনীর সুবেদার আলতাফ (ওরফে আফতাব) ১৭ জন জোয়ান নিয়ে যাদুরচরে এসে পৌঁছান। তিনি স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি বাহিনী তৈরি করেন, যা আলতাফ বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয় কর্ত্তিমারী বাজার সংলগ্ন শিক্ষক ও রাজনীতিক মতিউর রহমান- এর বাড়িতে। অতঃপর আলতাফ বাহিনী পাঁচটি ভাগে বিভক্ত হয়ে রৌমারীকে মুক্ত রাখার জন্য শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে। হাবিলদার মনসুরের নেতৃত্বাধীন প্রথম দলটি রাজিবপুরে অবস্থান নেয়; যাতে বাহাদুরাবাদ ঘাট, দেওয়ানগঞ্জ কিংবা জামালপুর থেকে পাকসেনারা অগ্রসর হতে না পারে। কোদালকাটিতে অবস্থান নেয়া দ্বিতীয় দলটির নেতৃত্বে থাকেন হাবিলদার রেজাউল। তৃতীয় দলটি অবস্থান গ্রহণ করে ছালিপাড়ায়; দলটির নেতৃত্ব দেন নায়েক মনসুর (২)। চিলমারী রুটে পাকবাহিনীর অভিযান প্রতিহত করার জন্য চতুর্থ দলটি মোজাহিদ কমান্ডার মফিজ-এর নেতৃত্বে ঠাকুরের চরে অবস্থান গ্রহণ করে। সুবেদার আলতাফ নিজের নেতৃত্বাধীন পঞ্চম দলটিকে হেড কোর্য়াটারে (রৌমারীতে) রাখেন। সে সময় রৌমারী সি.জি. জামান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ আজিজুল হক, তাঁর সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পত্রিকা ‘‘অগ্রদূত’’ এর নিয়মিত প্রকাশনা শুরু করেন।

 

মে মাসের ২৫ তারিখে দুপুর দু’টায় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ক্যাপ্টেন নওয়াজেশকে সঙ্গে নিয়ে সাহেবগঞ্জ থেকে সোজা জয়মনিরহাট ডাকবাংলোতে আসেন। সেখানে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ, সুবেদার আরব আলী ও অন্যান্যদের সাথে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা বলে তিনি আবার সাহেবগঞ্জ হয়ে ফিরে যান কুচবিহারে। ওইদিনই পাকসেনারা ধরলা নদী পার হয়ে কুড়িগ্রামের মুক্ত এলাকা নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারীর দখল নেয়ার জন্য রাত থেকে প্রচন্ড আক্রমণ শুরু করে। ২৬ মে আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। সুবেদার বোরহানের নেতৃত্বে হালকা ও যৎসামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকবাহিনীর আক্রমণ রোধকল্পে ঘোগাদহ, পাটেশ্বরী ও পাঁচগাছি এলাকায় অবস্থান নেয়। সুবেদার আরব আলী পাটেশ্বরীর পশ্চিম বরাবর উত্তর-পশ্চিম দিকে তার অবস্থান থেকে আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকেন। কিন্তু অস্ত্র গোলাবারুদের অপ্রতুলতায় পাটেশ্বরীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে। হেডকোয়ার্টারে সাহায্য চেয়ে সংবাদ পাঠানো হতে থাকে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হেডকোয়ার্টার থেকে যথোপযুক্ত সাহায্য প্রাপ্তি না ঘটায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে তারা এবং সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

পরদিন সকালে রায়গঞ্জ ও নাগেশ্বরী ঘাঁটি থেকে সামান্য কিছু গোলাবারুদসহ কিছু ই,পি,আর সদস্য সুবেদার বোরহানের সাহায্যার্থে পাটেশ্বরীর দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে বি,এস,এফ,এর কাছ থেকে প্রাপ্ত কিছু গোলাবারুদ এবং সংগৃহীত খাবার সঙ্গে নিয়ে একটি জীপ ও উনিশজন মুক্তিযোদ্ধাবাহী একটি ট্রাক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলিত হতে ধরলা নদীর দিকে রওয়ানা হয়। ওদিকে ধরলা নদী পার হয়ে পাকসেনারা তখন নাগেশ্বরীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, নাগেশ্বরী পার হয়ে তে-মাথার কাছে পৌঁছে রসদবাহী জীপের একজন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি আন্দাজ করতে পারেন। সাথে সাথে তাদের জীপ বাম দিকের কাঁচা রাস্তায় নেমে নাগেশ্বরী, রায়গঞ্জ হয়ে ভূরুঙ্গামারীতে ফিরে যায়। পিছনের মুক্তিযোদ্ধাবাহী ট্রাকটি পাকবাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে। সৈন্যদের প্রচন্ড গোলা বর্ষণের ফলে ট্রাকটি উল্টে রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে গর্তের মধ্যে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ড্রাইভার রববানীসহ সতের জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আজিজ আহত দশায় ধরা পড়েন, ভূরুঙ্গামারীর আকালু সামান্য আহত হয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পাটেশ্বরীর প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ায় সুবেদার বোরহান মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পূর্ব দিকে যাত্রাপুরের দিকে সরে পড়েন, তারপর নদী পার হয়ে মাদারগঞ্জ দিয়ে সোনাহাট চলে যান। সুবেদার আরব আলী ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চিম দিকে সরে যেয়ে ফুলবাড়িতে আশ্রয় নেন। সি,আর চৌধুরী তাঁর বিশেষ গেরিলা বাহিনীসহ দুধকুমার নদীর ওপারে চর-ভূরুঙ্গামারীতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ২৭ মে নাগেশ্বরী এবং ২৮ মে ভূরুঙ্গামারী পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়।

 

২৮ মে ভূরুঙ্গামারী পতনের পর ই,পি,আর-সহ মুক্তিযোদ্ধারা পূর্বদিকে আসাম সীমান্তের গোলকগঞ্জের সোনাহাট সীমান্ত সংলগ্ন মুক্তএলাকা সোনাহাট এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ সীমান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যতদূর সম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে সাহেবগঞ্জ এবং সোনাহাটে একত্র এবং পুনর্গঠিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সুবেদার বোরহান সোনাহাটে এবং সুবেদার আরব আলী, সুবেদার মোজাহার, হাবিলদার আনিস মোল্লা, সুবেদার শামছুল হক, সুবেদার মোস্তফা, সুবেদার মালেক চৌধুরী, হাবিলদার মোকসেদ, নায়েক খলিল, নায়েক খালেক, সিরাজ, কোয়ার্টার মাষ্টার রাজ্জাকসহ সকল ই.পি.আর সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সাহেবগঞ্জে সমবেত হন। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ সে সময় সপরিবারে সাহেবগঞ্জের হাজী সাহেবের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সাহেবগঞ্জে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা বামনহাট, চৌধুরীহাট ও গীতালদহ এবং মুক্ত এলাকা ফুলবাড়ীতে ছোট ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। ভূরুঙ্গামারীর উত্তরে পাগলাহাট, ধলডাঙ্গা, শিলখুড়ি, পশ্চিম-উত্তর দিকে মইদাম, বাঁশজানি, ফুলকুমার নদীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, নাগেশ্বরী থানার রামখানা, গাগলা, কাশিমপুর, অনন্তপুরসহ সমগ্র ফুলবাড়ী থানা, অপরদিকে সঙ্কোশ নদীর পূর্ব পাড়, সোনাহাটের উত্তর দিকে তিলাই, বহালগুড়ি, চর ভূরুঙ্গামারী, পাইকের ছড়া, দক্ষিণে বলদিয়া, সুবলপাড়, কচাকাটা, মাদারগঞ্জ, নাইকের হাট, নারায়নপুর ও চৌদ্দকুড়ি পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে প্রায় পঁচিশ মাইল এবং প্রস্থে কোথাও চার মাইল, কোথাও পাঁচ ও ছয় মাইল পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়। সোনাহাট মুক্ত এলাকার প্রধান ঘাঁটি এবং বলদিয়া, সুবলপাড় ও মাদারগঞ্জে ছোট ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। সঙ্কোশ নদীর ওপর পূর্বেই মধ্যবর্তী দু’টি অংশ ভেঙ্গে ফেলা সোনাহাট ব্রীজের পূর্ব প্রান্তে নদীর কিনারা বরাবর মুক্তিযোদ্ধারা শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে। সেই সাথে সোনাহাট, বলদিয়া, সুবলপাড় ও মাদারগঞ্জ ঘাঁটি থেকে সঙ্কোশ নদী অতিক্রম করে এবং পশ্চিমে সাহেবগঞ্জ, বামনহাট, চৌধুরীহাট, গীতালদহ ও ফুলবাড়ী ঘাঁটি থেকে পাকবাহিনীর দখলকৃত ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, জয়মনিরহাট, আন্ধারীঝাড়, রায়গঞ্জ, পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, উলিপুর, চিলমারী, লালমনিরহাট, মোগলহাট, হাতীবান্ধা, বড়বাড়ী প্রভৃতি অবস্থানের উপর মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ অব্যাহত থাকে। নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মোগলহাট-এ অবস্থানরত পাকবাহিনীর উপর অভিযান চালানোর সময় ফুলবাড়ী ও গীতালদহ মধ্যবর্তী ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতো।

 

জুন মাসের দিকে স্বাধীনতা-যুদ্ধ সফলভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ‘‘ বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স ’’ (বি.এল.এফ) গঠিত হয়। বি.এল.এফ ৪টি ভাগে বিভক্ত হয়ে সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই সংগঠনটির উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান ছিলেন সিরাজুল আলম খান। বি.এল.এফ-এর সদস্যদের উন্নত ধরনের অস্ত্রসহ গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয় ভারতীয় উত্তর প্রদেশের দেরাদুন ও আসামের হাপলং মিলিটারী একাডেমীতে। ভারতীয় গেরিলা কমান্ডো বিশেষজ্ঞ জেনারেল উবান প্রশিক্ষণের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন। উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে আখতারুজ্জামন মন্ডল, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী প্রমুখের নেতৃত্বে তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমার ৮টি থানায় রুকনুদ্দৌলা মন্ডল, নুর ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, মকসেদ আলীসহ আরো অনেক বি.এল.এফ-এর সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।

 

ওদিকে ১২ জুলাই কলকাতা ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে স্থাপিত মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে সেক্টর-অধিনায়কদের দশ দিন ব্যাপী এক দীর্ঘ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনেই বাংলাদেশকে মোট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটি সেক্টরের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে ৬ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের দু’টি সাব-সেক্টরের অধীন কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। কুড়িগ্রামের সদর থানা, লালমনিরহাট, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও উলিপুরের দূর্গাপুর ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরের অধীন এবং উলিপুর থানার অন্যান্য অংশ, চিলমারী ও রৌমারী ১১ নম্বর সেক্টরের মানকার চর সাব-সেক্টরের আওতাধীন ছিল।

অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত কুড়িগ্রাম কলেজের অধ্যাপক বলাই চন্দ্র পালের নেতৃত্বে উত্তরাঞ্চল সাংস্কৃতিক পরিষদ গঠন করা হয়। এই সাংস্কৃতিক পরিষদ ছয় নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন ঘাঁটিতে দেশাত্ববোধক গানের অনুষ্ঠান করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করত। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরেও অনুষ্ঠান করে মাতৃভূমিহারা নারী-পুরুষ-বৃদ্ধসহ সব শ্রেণীর শরণার্থীদের সাহস ও প্রেরণা যোগাতো। সাংস্কৃতিক পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র সরখেল, দেবব্রত বকসী বুলবুল, সাহানা, অলোক করঞ্জাই প্রমুখ। ভাওয়াইয়া শিল্পী কসিমুদ্দিন যদিও সাংস্কৃতিক পরিষদের সাথে যুক্ত ছিলেন না-কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সেখানে তিনিও কাজ করেছেন। তিস্তা পাড়ের শিল্পী হিসেবে ওপার বাংলায় তিনি তখন সদ্য পরিচিতি লাভ করছিলেন। সে সময় ভারতের কলম্বিয়া রেকর্ডিং কোম্পানীতে গান রেকর্ড করে তিনি যে রয়ালিটি পেয়েছিলেন-তার সমস্তটাই মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা করেছিলেন।

 

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নিমিত্তে ন্যাপ, সিপিবি এবং ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগেও যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড মনিকৃষ্ণ সেন, জিতেন দত্ত, শংকর বসু, চিত্তরঞ্জন দেব, ডাঃ কালীপদ বর্ম্মন, শামসুল হক, মোঃ বদরুজ্জামান প্রমুখ। এই বাহিনী লালমনিরহাট, ফুলবাড়ী ও মোগলহাটে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেয়। এদের উদ্যোগে ফুলবাড়ী নাওডাঙ্গা হাই স্কুলে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য একটি ফিল্ড হাসপাতাল খোলা হয়েছিল।

 

এদিকে কুড়িগ্রামে দখলকৃত জনপদগুলোতে বর্বর পাকিস্তানীরা এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায় ব্যাপক লুটতরাজ, ধর্ষণ, নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল। নরপশু পাকবাহিনীর সদস্যরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রী, শহর ও গ্রাম থেকে ধরে আনা কিশোরী, যুবতী ও গৃহবধূদের নির্বিচারে ধর্ষণ করত-গ্রামের পর গ্রাম, মহল্লার পর মহল্লা অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি যুবকদের ধরে এনে চোখ উপড়ে, পায়ের আঙ্গুল তুলে, গরম পানিতে ডুবিয়ে দিনের পর দিন অত্যাচার করত-হত্যা করত। ভূরুঙ্গামারী সি.ও. অফিসে, রায়গঞ্জের ব্রীজের ক্যাম্পে, কুড়িগ্রাম শহরের রিভার ভিউ হাই স্কুলে এবং সিএন্ডবি ডাকবাংলোয় পাক হানাদার বাহিনী গড়ে তুলেছিল ধর্ষণ ও নির্যাতন শিবির।

 

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ভূরুঙ্গামারী, সোনাহাট, পাটেশ্বরী, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, উলিপুর, চিলমারী, বড়বাড়ী, রৌমারী, মোগলহাট, লালমনিরহাট, পাটগ্রাম, বুড়িমারী, হাতীবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধরা পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শানিত করে।

 

সে সময় পাকিস্তানী নরপশুদের লুটপাট, ধর্ষণ, অত্যাচার, হত্যাকান্ডে প্রকম্পিত কুড়িগ্রামের বিভিন্ন জনপদে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাভিযান অব্যাহত থাকে। সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকায় কখনও গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখ সমরে পাকবাহিনী ও এ দেশীয় দালাল, রাজাকারদের পর্যুদস্ত করে তোলে।

 

১ আগষ্ট রৌমারীতে অবস্থানরত আলতাফ বাহিনী চিলমারীতে পাকবাহিনীকে আক্রমণ করে তাদের পরাজিত করে বালাবাড়ী পর্যন্ত দখল করে নেয়। সে যুদ্ধ ‘চিলমারী রেইড’ নামে পরিচিত। পরে ৪ আগষ্ট পাকবাহিনী নৌপথে দক্ষিণ দিক থেকে তিনটি গানবোট এবং দু’টি লঞ্চ ভর্তি হয়ে চিলমারী ঘাটে পৌঁছে। ওইদিনই তারা ছালিপাড়া ও কোদালকাটি আক্রমণ করে দখল করে নেয়। তখন সেখানকার ডিফেন্স সরিয়ে যাদুর চরে স্থানান্তর করা হয়। এই সময় থেকে রৌমারী, যাদুর চর, রাজিবপুর ও মোহনগঞ্জ পর্যন্ত পুরো এলাকা মানকার চর সাব-সেক্টরের অধীনে ছিল। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন কর্ণেল তাহের। ১১ নম্বর সেক্টরের এই অঞ্চলে ‘‘ জেড ফোর্স’’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান মাঝে মাঝে আসতেন। তাঁর বাহিনীর তৎপরতা এ এলাকাগুলোতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। রৌমারীতে সর্ববৃহৎ প্রশিক্ষণ শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র আবুল কাশেম চাঁদ। ওই সেক্টরে বীর প্রতীক তারামন বিবিও ছিলেন। পরবর্তীতে পাকসেনারা ছালিপাড়া ও কোদালকাটি দখল করলেও রৌমারীর বাকী অংশ সম্পূর্ণরূপে মুক্তাঞ্চল ছিল।

 

এদিকে ১ আগষ্ট সংঘঠিত হয় আন্ধারীঝাড় অপারেশন। সেদিন সত্তর জন মুক্তিযোদ্ধা এ্যামবুশ করে পাকবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনসহ ১১ জন হানাদারকে হত্যা করে। ৫ আগষ্ট মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বামনহাট যুব শিবিরের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল ওহাব তালুকদার দু’জন সঙ্গীসহ সীমান্ত পার হয়ে পরিত্যাক্ত রেলপথ ধরে শিংঝাড়ের দিকে এগোনোর সময় রেল লাইনের পাশে জংগলে লুকিয়ে থাকা পাকবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে শহীদ হন। ৮ আগষ্ট ভূরুঙ্গামারীর পুরাতন পাটেশ্বরীর সোনাহাট ব্রীজের প্রতিরক্ষা ব্যুহতে পাকবাহিনী প্রচন্ড আক্রমণ করে। প্লাটুন কমান্ডার আব্দুল কুদ্দুছ নান্নুসহ অনেকেই নদী পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারলেও নুরুজ্জামানসহ দু’জন পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরে অসীম সাহস আর বুদ্ধিমত্তার জন্য আহত অবস্থায়ও নুরুজ্জামান পালাতে সক্ষম হন। সেদিন মকবুল, আজিজসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

আগষ্টে দূর্গাপুর ও ফুলবাড়ীতে বড় ধরনের আরো দুটি অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা স্মরণীয় সাফল্য অর্জন করেন। কুড়িগ্রাম উলিপুরের মধ্যবর্তী দূর্গাপুরের অর্জুনেরডারায় রেলব্রীজে মাইন পুঁতে মুক্তিবাহিনী পাকসৈন্যবাহী ট্রেন উড়িয়ে দেয়। ওই অভিযানে মোগলবাসার নূরুসহ অনেকে শহীদ হন। এদিকে ১১ আগষ্ট পাকবাহিনী ফুলবাড়ী দখলের চেষ্টা করলে ফুলবাড়ীস্থ খানকা শরীফের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সেদিনের ব্যর্থ চেষ্টার পর আবার পরদিন ১২ আগষ্ট গভীর রাতে ফুলবাড়ী দখলের উদ্দেশ্যে তিনটি নৌকা বোঝাই হয়ে পাকবাহিনীর প্রায় ৫০/৬০ জনের একটি দল কুলাঘাট পার হয়ে ফুলবাড়ী অভিমুখে যাত্রা করে। যাত্রার প্রাক্কলেই এবারও তারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে। উভয় পক্ষে তুমুল গোলাগুলি বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে তিনটি নৌকাই পাকসৈন্য সমেত ডুবে যায়। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৩২ জন সৈন্য নিহত হয়। তাদের লাশ নদীতে ভেসে যায়। পরবর্তীতে সেই লাশগুলো কুড়িগ্রামের সিএন্ডবি ঘাটে পাওয়া গিয়েছিল। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন কোম্পানী কমান্ডার কে.এম. আকরাম হোসেন।

 

৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১; সুবেদার মেজর আরব আলীর কমান্ডে মুক্তিবাহিনী নাগেশ্বরীতে একটি সফল অভিযান চালায়। ওইদিন তারা ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে পাঁচ জন পাকসেনাকে হত্যা করে। এ আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা তিন ইঞ্চি মর্টার ব্যবহার করেছিল।

ওদিকে ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর তাহের রৌমারীকে মুক্ত, নিরাপদ এবং স্বাধীন রাখার মানসে ১১ অক্টোবর পাক ঘাঁটি চিলমারী আক্রমণ করেন। এ অভিযানে অংশ নেন নায়েব সুবেদার মান্নান, কোম্পানী কমান্ডার আবুল কাশেম চাঁদ, নজরুল ইসলাম (খায়রুল আলম) প্রমুখ। এ আক্রমণে পাকিস্তানীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিল অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার করা এবং মুক্তিবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে পাকিস্তানীদের অবহিত করানো। মুক্তিযোদ্ধাদের এই সফল অভিযানে পাকিস্তানী সৈন্যরা সেদিন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

 

এদিকে ১৪ অক্টোবর সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর নওয়াজেশউদ্দিনের কমান্ডে একই সঙ্গে ভূরুঙ্গামারী ও জয়মনিরহাটে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ভয়াবহ ধরনের পৃথক পৃথক দু’টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাত একটা’র দিকে (১৪ অক্টোবর) মুক্তিবাহিনী ভূরুঙ্গামারী ও জয়মনিরহাটে পাকিস্তানী অবস্থানের উপর ব্যাপক হামলা চালায়। উভয় পক্ষের তুমুল সংঘর্ষ ১৪ তারিখ সকাল সাতটা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। দ’ুটি রণাঙ্গনেই চরম মার খায় পাকিস্তানীরা। ভূরুঙ্গামারী ও জয়মনিরহাট মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পাকিস্তানীদের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার ছাড়াও ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের  আট জন সৈন্যসহ একজন আর্টিলারীর ক্যাপ্টেন মুক্তিবাহিনীর হাতে বন্দি হয়। মুক্তিবাহিনীর এই বিজয়ের পর ১১ নম্বর সেক্টরের ছয়’শ বর্গমাইল এলাকা শত্রু মুক্ত হয়।

 

সেপ্টেম্বর/অক্টোবর মাসে মুক্তিবাহিনীর প্রথম প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কমিশন্ড অফিসারবৃন্দ যথাক্রমে-২য় লেঃ সামাদ,  মাসুদ, ফারুক, আব্দুল মতিন চৌধুরী ও আবদুল্লাহ ৬ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সাব-সেক্টরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।  ৬ নম্বর সেক্টর এলাকার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ মাউনটেন ডিভিশনকে নিয়োগ করা হয়। ব্রিগেডিয়ার জসি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। সে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোরের অভিজ্ঞ অধিনায়ক লেঃ জেনারেল থাপ্পা উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহে যুদ্ধ পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত হন।

 

১৩ নভেম্বর, ১৯৭১; পাকবাহিনী উলিপুরের হাতিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ ও পৈচাশিক গণহত্যা সংগঠিত করে ওইদিন। পাক সেনারা স্থানীয় দালাল, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস্দের দেয়া তথ্য ও খবর মোতাবেক তিন দিক থেকে ঘিরে নিরীহ, নিরস্ত্র হাতিয়া ইউনিয়নের অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ চালায়। সেদিন পূর্বাহ্নে মন্ডলের হাট দিয়ে অগ্রসরমান পাকবাহিনীকে প্রতিহত করতে গিয়ে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব, আবুল কাশেম, মোন্তাজ আলী, হীতেন্দ্র নাথ ও গোলজার হোসেন। সব প্রতিরোধ ভেঙ্গে পাকবাহিনী হাতিয়ায় প্রবেশ করে এলোপাথারী গুলি চালাতে থাকে। পাকসৈন্যরা সেদিন ৭৬৪ জন হাতিয়াবাসীকে হত্যা করে। ওই পৈচাশিক হত্যাকান্ড ‘‘হাতিয়া  হত্যাকান্ড’’ নামে পরিচিত। এছাড়াও পাকবাহিনী ও তাদের দালালদের দ্বারা সংঘঠিত কাঁঠালবাড়ী গণহত্যা, বড়বাড়ি হত্যাকান্ড, গাগলা অভিযান ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ সময়গুলোতে মুক্তিবাহিনী অসংখ্য গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

 

নভেম্বরের ১১,১২ ও ১৩ তারিখে প্রথমে মুক্তিবাহিনী ও পরবর্তীতে ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং যৌথ বাহিনী ভূরুঙ্গামারীতে অবস্থানকৃত পাকবাহিনীর উপর তীব্র আক্রমণ চালায়। ফলশ্রুতিতে ১৪ নভেম্বর সকালে ভূরুঙ্গামারীর পতন ঘটে। পাকবাহিনী পিছু হটে রায়গঞ্জে অবস্থান গ্রহণ করে। ১৬ নভেম্বর যৌথবাহিনী আন্ধারীঝাড়ে অবস্থান নিয়ে রায়গঞ্জ আক্রমণ শুরু করে। ১৯ নভেম্বর রাত থেকে রায়গঞ্জে অবস্থানরত পাকবাহিনীর উপর তিনদিক থেকে প্রচন্ড আক্রমণ শুরু হয়। যুদ্ধ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ২০ নভেম্বর রাতে যুদ্ধরত অবস্থায় লেঃ আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাথে সাথে শহীদ হন। ওই যুদ্ধ ২১ নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ২১ নভেম্বর যৌথ বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পাকসৈন্যরা পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে। সেদিনই যৌথ বাহিনী রায়গঞ্জ দখল করে এবং লেঃ আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদের লাশ উদ্ধারের পর করবস্থ করে।২৭ নভেম্বর ব্যাপারীহাটে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের আবার যুদ্ধ বাঁধে। ২৮ নভেম্বর তুমুল যুদ্ধের পর নাগেশ্বরীর পতন ঘটে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পাকবাহিনী ধরলা পার হয়ে কুড়িগ্রামের দিকে পিছু হটে। মুক্ত হয় উত্তর ধরলার সব রণাঙ্গন।

১ ডিসেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী ধরলা নদী পার হয়ে এসে এপারে কুড়িগ্রাম শহরে অবস্থানরত পাকবাহিনীর উপর অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালাতে থাকে। সে সময় মিত্রবাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে ৪ ও ৫ ডিসেম্বর পর পর দু’দিন বিমান হামলা চালায়।

 

আসে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১; সেদিন কুড়িগ্রামে ভোরের সূর্য ওঠে একটি ঐতিহাসিক দিনকে সঙ্গে নিয়ে। ঐদিন খুব ভোরে উলিপুরে অবস্থানরত পাকবাহিনী পিছু হটে কুড়িগ্রামে আসে। সকালে তাদের উপর বিমান হামলা করা হয়। বিকাল ৩টার দিকে পাকবাহিনী ট্রেনযোগে গুলি করতে করতে কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে রংপুরের দিকে চলে যায়। শত্রুমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম শহর। কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধা বিকেলে কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। তারপর প্রবেশ করে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। বিকাল ৪টায় কুড়িগ্রাম নতুন শহরস্থ পানির ট্যাংকের উপর মুক্তিযোদ্ধারা উত্তোলন করে বহু আকাঙ্খিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। পরদিন, ৭ ডিসেম্বর সকালে সুবেদার মেজর আরব আলী কুড়িগ্রামে আসেন। জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সভা করে তিনি একটি কমিটি গঠন করে কুড়িগ্রামে বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন।


Share with :

Facebook Twitter