মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

       উত্তর জনপদের একটি জেলা কুড়িগ্রাম। এ জনপদের ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, আছে স্বকীয়তা, আছে বৈশিষ্ট্য। (একদিনে এর ইতিহাস গড়ে ওঠেনি, একযুগে গড়ে ওঠেনি এর ঐতিহ্য। সুদীর্ঘ যুগের চড়াই উৎরাই, ভাঙ্গা-গড়া, জয়-পরাজয়, আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে এ জনপদ, এর মানুষ, এর জীবনধারা, এর বৈশিষ্ট্য।) কীর্তিনাশা ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ফুলকুমার এ জনপদের যেমন অনেক কিছু গ্রাস করেছে, অন্যদিকে দেশী-বিদেশী নিষ্ঠুর শাসন-শোষণের যাতাকলে নিষ্পেষিত, বিপর্যস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। আশ্চর্য, তবুও মানুষ থেমে থাকেনি, এগিয়ে গেছে প্রতিনিয়ত লড়াই করে। উত্তর জনপদের বিচিত্র এ অঞ্চল, বৈচিত্রময় তার ইতিহাস।

 

অতি প্রাচীন এ জনপদ; প্রাগৈতিহাসিক আদিম সভ্যতার লীলাভূমি। এ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা উপত্যকায় আদিম মানুষের প্রথম ঘটেছিল আবির্ভাব। নিগ্রো-অষ্ট্রিক দ্রাবিড়-মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর মিলিত রক্তধারায় গড়ে উঠেছে এখানকার প্রাচীন সভ্যতা-যা অনার্য সভ্যতা বলে সর্বজন স্বীকৃত। এ অঞ্চলের মানুষের চেহারায়, আকৃতিতে, রক্তে, ভাষায়, আচার-আচরণে প্রাগৈতিহাসিক জনগোষ্ঠীর ছাপই শুধু বিদ্যমান নয়, অনেক বৈশিষ্ট্য আজো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বিচিত্র এ জনপদ। কখনো গৌড়বর্ধনে কখনো প্রাগজ্যোতিষপুরে এ অঞ্চল ছিল অন্তর্ভূক্ত। গৌড়বর্ধন আজকের মহাস্থানগড়, প্রাগজোতিষপুর কামরূপের প্রাচীন নাম, আজকের আসাম। এ দুটি রাজ্য ছিল অনার্য অধ্যুষিত অঞ্চল। রাজ্যের রাজারা ছিলেন অনার্য। তারা দীর্ঘকাল ধরে আর্যদের সঙ্গে লড়াই করেছেন। স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রেখেছেন। দীর্ঘকাল ধরে অনার্য, কোল, ভিল, গারো, কোচ, মেচ, হাজং, কিরাত, কুকি, ভুটিয়া, নাগা, তিববতী, কাছার, অহোম ঐক্যবদ্ধভাবে আর্যদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, সমুন্নত রেখেছে তাদের স্বকীয়তা। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আর্যরা সহজে প্রবেশ করতে পারেনি। তাই এ অঞ্চলে আর্য সভ্যতার কোন চিহ্ন নেই, পাওয়া যায়নি কোন পরিচয়। ব্রাহ্ম্য-ধর্ম এ অঞ্চলে সমাদৃত হয়নি। শংখচক্র গদাধরী কৃষ্ণ এখানে ঠাঁই পায়নি; পেয়েছে বংশীধারী কানু।

 

ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন ইতিহাসের বিধান। বিশাল কামরূপ রাজ্য খন্ডে খন্ডে বিভক্ত হয়ে কুচবিহার রাজ্য, উয়ারী রাজ্য, অহোম রাজ্য, কুকি রাজ্য, ত্রিপুরা রাজ্য ও আরাকান রাজ্যের সৃষ্টি হয়। এ জনপদের উত্তরাংশ অর্থাৎ নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, লালমনিরহাট ও ভূরুঙ্গামারী ছিল কুচবিহার এবং দক্ষিণাংশ অর্থাৎ উলিপুর, চিলমারী ও রৌমারী ছিল উয়ারী রাজ্যভূক্ত। আজো উয়ারী রাজ্যের স্মৃতি উলিপুর থেকে ৪ মাইল পূর্বে উয়ারী নামক জনপদে দাঁড়িয়ে আছে¾যা হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। এই জনপদে ময়নামতি, মানিকচাঁদ, গোপীচাঁদ, ভরচাঁদ, উদয়চাঁদ, অদুনা-পদুনার অনেক কাহিনী ও কিংবদন্তী ছড়িয়ে রয়েছে। এখনও কুচবিহার রাজ্যের অনেক স্মৃতিচিহ্ন জেগে রয়েছে পাঙ্গা, মোগলহাট, লালমনিরহাট, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী অঞ্চলে।

 

বারো শ শতকের প্রথমদিকে রংপুরে খেন বংশের অভ্যুদয় ঘটে। এ বংশের রাজা ছিলেন নীলধ্বজ, চক্রধ্বজ ও নীলাম্বর। খেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন নীলাম্বর। তার রাজধানী ছিল চতরা নামক স্থানে। চতরা ছিল বর্তমান উলিপুর উপজেলার অন্তর্গত বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে অবস্থিত। এখানেই ছিল রাজা নীলাম্বরের দুর্গ। নীলাম্বর ছিলেন এক শক্তিশালী রাজা। ১৪১৮ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ আক্রমণ করেন নীলাম্বরের রাজ্য। তিস্তা নদীর পারে উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে রাজা নীলাম্বর পরাজিত হয়ে আসামে পালিয়ে যান। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় রাজা নীলাম্বরের রাজধানী। নীলাম্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন সুলতান হোসেন শাহের পুত্র নাসির উদ্দিন আবুল মোজাফফর নশরত শাহ। খেন বংশের পতনের পর এ অঞ্চল মুসলিম সুলতানরা করায়ত্ব করে, পরে আসে মোগলদের করতলে। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে, নেমেছে লড়াইয়ে। সেজন্য মোগল আমলে সেনাপতি মানসিংহ, সেনাপতি মীরজুমলা, এবাদত খাঁ, আলীকুলি খান, শাহ্ ইসমাইল গাজী প্রমুখকে সেনাবাহিনী নিয়ে ছুটে আসতে হয়েছে, দমন করতে হয়েছে বিদ্রোহ। কেননা হিমালয় পর্বত ও আসামের গাঢ় পাহাড় শ্রেণীর পাদদেশে অবস্থিত এ অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

 

সংগ্রামী এ জনপদ। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজত্ব এ অঞ্চলের মানুষ মেনে নেয়নি। করেছে তারা মুক্তির সংগ্রাম। ব্রিটিশ কোম্পানীর দালাল দেবী সিং ও হরে রাম এ অঞ্চলের দেওয়ান হয়ে আসে। এদের অত্যাচার ও শোষণে দেখা দেয় ইতিহাস প্রসিদ্ধ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। এ অঞ্চলের হাজার হাজার নর-নারী-শিশু যেমন অনাহারে অর্ধাহারে মরেছে, তেমনি মুক্তির জন্য হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। এ সংগ্রামে হিন্দু মুসলিম হয়েছিল একাত্ম। তারা মজনু শাহ, নুরউদ্দিন কারেক জং, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরাণী, দয়াশীল, মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ্ প্রমুখের নেতৃত্বে করেছে জীবনপণ সংগ্রাম। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, প্রজা বিদ্রোহ নামে এগুলো আখ্যায়িত করা হয়েছে বটে; কিন্তু আসলে এগুলো ছিল এ অঞ্চলের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, আজাদীর সংগ্রাম। কত জীবন ঝরে গেছে, রক্তাক্ষরে লিখে গেছে নাম¾তার হিসেব নেই। আজো এ অঞ্চলের মাটিতে সংগ্রামীদের স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে। এখনও পাঠকপাড়া, বজরা, সুভারকুঠি, নাউয়ার হাট, দূর্গাপুর, ফরকের হাট, উলিপুর, মোগলহাট, নাজিমখাঁ, বড়বাড়ী, চিলমারী, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট, পান্ডুল প্রভৃতি জনপদে অনেক স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে এ অঞ্চলের মানুষের অবদান স্মরণীয়। সেজন্য এ অঞ্চলের মানুষের উপর শুধু নির্যাতনেরই ষ্টিম রোলার চালান হয়নি, বরং এ জনপদকে অবহেলিত ও পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল।

 

১৮৫৮ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে ভারতের শাসন ভার ব্রিটিশ সরকার নিজ হাতে তুলে নেয়। ব্রিটিশ সরকার শাসন-শোষণকে মজবুত করার জন্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে শক্ত প্রশাসনের মাধ্যমে। কোম্পানী আমলে কুড়িগ্রাম চারটি বিভাগে (থানা) বিভক্ত ছিল। এ বিভাগগুলো হচ্ছে বড়বাড়ী, উলিপুর,চিলমারী ও নাগেশ্বরী। এখান থেকে কোম্পানীর কালেক্টররা নিয়মিত এসে রাজস্ব আদায় করে নিয়ে যেতো। তখন কুড়িগঞ্জ ছিল বড়বাড়ী বিভাগের একটি স্থান, বালাবাড়ী ছিল কুড়িগঞ্জের প্রধান কেন্দ্র। এখন সে বালাবাড়ী পাটেশ্বরীর পাশে অবস্থিত। ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৫ সালের ২২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত করে কুড়িগ্রাম মহকুমা। লালমনিরহাট, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, নাগেশ্বরী ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রাম থানা নিয়ে গঠিত হয় এ মহকুমা। স্যার উইলিয়াম হান্টার তাঁর Gazetter of the Rangpur District-এ কুড়িগ্রাম-কে কুড়িগঞ্জ বলেছেন। ১৮০৯ সালে ডাঃ বুকালন হ্যামিলটন তাঁর বিবরণীতে বলেছেন-Kuriganj of which the market place is called Balabari in a place of considerable trade (martins Eastern India)। মিঃ ভাস তাঁর রংপুরের বিবরণীতেও এ অঞ্চলকে কুড়িগঞ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কুড়িগঞ্জ নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে কেউ কিছুই বলেননি।

 

কুড়ি শব্দটি অনার্য। এখানো গ্রাম বাংলায়, বিশেষ করে এ অঞ্চলে কুড়ি হিসেবে গোনার পদ্ধতি চালু রয়েছে। বিশিষ্ট পন্ডিত জা পলিলুস্কি প্রমাণ করেছেন যে, গণনার এই পদ্ধতি বাংলায় এসেছে কোল ভাষা থেকে। কোল অষ্ট্রিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত। আরব অষ্ট্রিক ভাষায় কুর বা কোর ধাতুর অর্থ হলো মানুষ। কুড়ি হিসেবে গোনার পদ্ধতিটিও এসেছে মানুষ থেকেই। এ অষ্ট্রিক কারা ? পন্ডিতদের মতে, প্রত্ন-প্রস্তর যুগে এ অঞ্চলে বাস করতো নিগ্রো জাতি। এরপর আসে নব্য-প্রস্তর যুগ। আসামের উপত্যকা অতিক্রম করে আসে অষ্ট্রিক জাতীয় জনগোষ্ঠী। তারপরে আসে দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয়। এদের মিলিত স্রোতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মানব সভ্যতার সূচনা হয়। এরাই লাঙ্গল দিয়ে চাষের প্রবর্তন করেছে। কুড়ি হিসেবে গোনার পদ্ধতি করেছে চালু। নদ-নদীতে ডিঙ্গি বেয়েছে, খেয়েছে শুটকী, খেয়েছে বাইগন বা বেগুন, লাউ বা কদু, কদলী বা কলা, জাম্বুরা, কামরাঙ্গা। করেছে পশু পালন। এঁকেছে কপালে সিঁন্দুর। করেছে রেশম চাষ। করেছে তামা, ব্রোঞ্জ ও সোনার ব্যবহার।

 

এ জেলার রয়েছে প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এ অঞ্চলে এখনও অনুষ্ঠিত হয় চিলমারীর অষ্টমীর মেলা, সিঁন্দুরমতির মেলা, মাদাইখালের মেলা, মাসানকুড়ার মেলা, দশহরার মেলা, চেংরার মেলা, সিদ্ধেশ্বরীর মেলা, কালীর মেলা, শিবের মেলা, গাজীর মেলা¾কত যে মেলা তার ইয়ত্তা নেই। এই মেলাগুলো মানুষের শুধু বিকি-কিনির আড়তই নয় বরং মানুষের মানসিক প্রশান্তির খোরাকও বটে। এ জনপদে গড়ে উঠেছে অনেক নাট্যমন্দির। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম ন্যাশনাল থিয়েটার হল, বীণাপানি নাট্যমন্দির, উলিপুর নাট্যমন্দির, ভিতরবন্দ নাট্যমন্দির, পাঙ্গা নাট্যমন্দির ছিল প্রসিদ্ধ। পরবর্তী সময়ে শিল্পকলা হল, পৌরসভা হল, টাউন হল-এর নাম উল্লেখ্য।

 

কুড়িগ্রামের সৌভাগ্যের দিন, নতুন দিগন্তে উত্তরণের দিন ২৩ শে জানুয়ারী ১৯৮৪ সাল। এদিনে ‘‘কুড়িগ্রাম’’ মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয়।


Share with :
Facebook Twitter